৫০ বছরেও হলো না ভাষানীতি

0
42
৫০ বছরেও হলো না ভাষানীতি

বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনও উপেক্ষিত। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও হয়নি ভাষানীতি। ফলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও উচ্চ আদালত, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষা ব্যবহূত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষাকে গুরুত্বহীন করে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্ব পাচ্ছে ইংরেজি ও আরবি ভাষা। আবার বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিই প্রণীত হয়েছে সম্পূর্ণ ইংরেজি ভাষায়। একইভাবে ভাষানীতি না থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা অর্থাৎ মাতৃভাষা।

এমন অবস্থার মধ্য দিয়েই দেশে আজ রোববার ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর পূর্ণ হলো। পালিত হচ্ছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এ দিনে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিল বাঙালিরা। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তরে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। অথচ এখনও উপেক্ষিত সর্বত্র বাংলা ভাষা চালুর বিষয়টি। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভাষাসংগ্রামী, শিক্ষাবিদসহ বিশিষ্টজন। তাদের মতে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের উদাসীনতায় স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য ভাষানীতি প্রণয়ন করা জরুরি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সব সরকারি অফিস, আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করব না।

তাহলে সর্বক্ষেত্রে কোনো দিনই বাংলা চালু করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। এভাবেই অগ্রসর হতে হবে।’ এরপর বাহাত্তরের ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে পাসের মধ্য দিয়ে দেশে কার্যকর করা হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের বাংলাদেশ সংবিধান। সেই সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্রভাষা’ প্রসঙ্গে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’

সংবিধানের আরও তিনটি অনুচ্ছেদে বাংলা ভাষার কথা উল্লেখ রয়েছে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে দেশে আইনও করা হয় ১৯৮৭ সালে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের বিষয়ে উচ্চ আদালত কয়েক দফা নির্দেশনা দিলেও টনক নড়েনি সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের। ফলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ’ এবং বাংলা একাডেমির ‘প্রমিত বানানরীতি’ও মানা হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জাতীয় অধ্যাপক ভাষাসংগ্রামী ড. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি এলেই বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে সবার ঘুম ভাঙে। এরপর আবার সবাই ঘুমে চলে যায়। কাজেই এ নিয়ে আলোচনা অর্থহীন।’ তার মতে, ‘যদি সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে আমাদের ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের দিকে নজর দিতে হবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের গঠিত এই কমিশন পঁচাত্তরের আগেই রিপোর্ট দিয়েছিল।’

আরেক ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলেন, ‘বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই। কারণ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রেণিস্বার্থের প্রয়োজন মিটে গেছে। তখন থেকেই তারা ঔপনিবেশিক ভাবধারায় ইংরেজি ভাষাকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছেন। ফলে নতুন করে ইংরেজির বাংলা পরিভাষা তৈরি হয়নি। মূলত এ জন্য যে পরিশ্রম করা দরকার সেটি আমরা করতে চাইনি।’

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের সংগঠক আহমদ রফিক আরও বলেন, ‘এখনও সময় আছে, একটি ভাষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। যারা দ্রুততম সময়ে একটি ভাষানীতি প্রণয়ন করে বাংলা ভাষা ব্যবহারে যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। এর সঙ্গে বাংলা পরিভাষা প্রণয়ন এবং অনুবাদের দিকেও আমাদের নজর বাড়াতে হবে। নয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে ইংরেজি ভাষার বিস্তার ঠেকানো যাবে না। বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ভাষার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’

পৃথিবীর অনেক দেশের মধ্যে ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, রাশিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলোতে রয়েছে নিজস্ব ভাষানীতি। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালেও রয়েছে নিজস্ব ভাষানীতি। এর আলোকে তাদের উচ্চ আদালতে মাতৃভাষায় রায় দেওয়া হচ্ছে। অথচ দেশের উচ্চ আদালতে এখনও বাংলা ভাষা ব্যবহার হয় কালেভদ্রে। শতাধিক বিচারপতির মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বাংলায় রায় দিয়েছেন ১২ জন বিচারপতি। তাদের মধ্যে নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দেন একজন বিচারপতি।