
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো চলছে ভেজাল মদের রমরমা ব্যবসা। ভেজাল মদ খেয়ে মাঝেমধ্যেই আসছে মৃত্যুর খবর। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের জীবনও রীতিমতো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অন্ধ কিংবা কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন অনেকে। বিশেষ করে সম্প্রতি বগুড়ায় ভেজাল মদ খেয়ে ২০ জনের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ সরকারের উচ্চপর্যায়কে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ম্যানেজ করেই ভেজাল মদের কারখানা চলে আসছে। আবার ওষুধের উপকরণের দোহাই দিয়ে হোমিও ফার্মেসিগুলোতে অতিমাত্রায় ইথানল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, সেসব দোকানে রাখা হচ্ছে মিথানল নামের বিষ। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে চোলাই মদে সুগন্ধি আনতে মাঝেমধ্যেই অতিমাত্রায় অ্যামুনিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সেবনকারীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভেজাল মিথানল সংরক্ষণ ও বাজারজাতের কারণে দফায় দফায় গ্রেফতার হয়েও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অন্যরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছে। আবার অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি এক বোতল মদের সঙ্গে আরও দুই বোতল টিউনিং করে একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের অর্থ।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অল্প পরিমাণ টাকা লাভের জন্য ইথানলের স্থলে মিথানলের মতো সরাসরি বিষ মেশানো হচ্ছে মদের সেই টিউনিং করা বোতলে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) পরিচালক (গোয়েন্দা ও অপারেশন) উপমহাপরিদর্শক কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘বগুড়ার ঘটনায় দেখা গেছে হোমিও ফার্মেসির লোকজন বরাদ্দের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় রেক্টিফায়েড স্পিরিট মজুদ করে রাখছেন। অথচ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমরা সেখানে অভিযান চালাতে পারি না। তারা উচ্চ আদালতে দফায় দফায় সাতটি রিট করে রেখেছেন। তবে শিগগিরই আমরা আইনগতভাবে এর মোকাবিলা করব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যেভাবে মদে বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটে সেগুলোর সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখে নজরদারি অব্যাহত রেখেছি।’
বগুড়া ডিএনসি সূত্র বলছে, করতোয়া হোমিও ল্যাবরেটরির নামে বছরে ২৯ লিটার রেক্টিফায়েড স্পিরিট বরাদ্দ আছে। অথচ সেখান থেকে ১ হাজার ৫০০ লিটার রেক্টিফায়েড স্পিরিট জব্দ করা হয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ স্পিরিট এই কারখানায় কীভাবে এলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই অবস্থা বাকি হোমিও ফার্মেসিগুলোরও। ৩১ জানুয়ারি রাতে গাজীপুরের একটি রিসোর্টে বিজ্ঞাপনী সংস্থা ফোরথপিআরের ৪৩ জন কর্মী বিষাক্ত মদ পান করেন। পরদিন সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই এজেন্সির দুই কর্মী শিহাব জহির ও মীর কায়সারের মৃত্যু হয়। পরে মহাখালীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান। এই তিনজনের মধ্যে জহিরের মৃত্যুর ঘটনায় কাফরুল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়।
২৯ জানুয়ারি বিষাক্ত মদপানে রাজধানীর বেসরকারি ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ জানায়, ২৯ জানুয়ারি শুক্রবার বন্ধুদের সঙ্গে ইউল্যাবের ওই ছাত্রী উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় যান। সেখানে অসুস্থতা বোধ করলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বন্ধুর বাসায়। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় শনিবার তাকে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার মৃত্যু হয় তার।
সূত্রমতে, জানুয়ারির শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিক পর্যন্ত কয়েক দিন ভাটারা এলাকায় তিনজন, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় একজন এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় দুজনসহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশে আলোড়ন ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়। প্রত্যেকেই মদ পানের পর অসুস্থ হয়ে মারা যান। বিভিন্ন থানা এলাকায় একাধিক মামলাও হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দাতথ্যের ভিত্তিতে ভেজাল অবৈধ মদ তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সন্ধান পায় ডিবি। গ্রেফতার করে এ চক্রের পাঁচজনকে।
এর আগে গত বছর ২৮ মে দিনাজপুরের বিরামপুর ও রংপুরের শ্যামপুর এলাকায় বিষাক্ত মদপানে ১১ জনের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে আটজনই ছিলেন দিনাজপুরের।
রাজধানীর আনোয়ার খান মডেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, গত ছয় মাসে তারা এ ধরনের অন্তত ১৩ জন রোগী পেয়েছেন। পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে এমন রোগী ভর্তি হয়েছেন ১০ জনের বেশি। পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালেও ভর্তি হয়েছেন ভেজাল মদে অসুস্থ বেশ কয়েকজন। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।


