নারীর ক্ষমতায়ন

0
36

অপরাজয়া ডেস্ক : বাংলাদেশে নারী যুগ যুগ ধরে শোষিত অবহেলিত হয়ে আসছে। পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার, নিপীড়ন, কূপমণ্ডুকতা ও বৈষম্যের বেড়াজালে নারীকে সর্বদা রাখা হয়েছে অবদমিত। তার মেধা ও শ্রমশক্তিকে শুধুমাত্র সাংসারিক কাজে ব্যয় করা হয়েছে। সমাজ ও দেশ গঠনে তাকে কখনো সম্পৃক্ত করা হয়নি। শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বব্যাপী নারীরা শিক্ষা–দীক্ষায় পিছিয়ে আছে। পরিবার ও সমাজে এখনো তাদের স্থান পুরুষের সমকক্ষ নয়। মনে করা হয় পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে নারীর ক্ষমতায়নের খুব প্রয়োজন নেই। ফলে নারীরা তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অধিকার লাভ করেনি। কিন্তু নারীকে বাদ দিয়ে মানব সম্পদ উন্নয়নের কথা ভাবা যায় না।

ক্ষমতায়ন হলো ব্যক্তির নিজ জীবন ব্যক্তি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তা ঠিক করা। পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করা। ক্ষমতায়ন ব্যক্তির ভেতরে আত্মবিশ্বাস দৃঢ় করে। এই আত্মবিশ্বাস দ্বারা ব্যক্তি তার সমস্যার সমাধান করতে শেখে এবং স্বনির্ভর হয়। নারীর ক্ষেত্রে ক্ষমতায়ন বিষয়টি জটিল। নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে কি–না তা বুঝতে হলে দেখতে হয় সম্পদের উপর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি–না, সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নারী সক্ষম কি–না, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফল নারী ভোগ করতে পারছে কি–না। অর্থাৎ নারী সরাসরিভাবে উন্নয়নের সুফল ভোগী কি–না।

বাংলাদেশের বর্তমানে নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হলো রাজনীতি চর্চায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। ভোট প্রদান, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলে সক্ষমতার জায়গার অর্জন কতটুকু নিশ্চিত তা বোঝায়। সংসদে সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু নারীদের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত করে বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষে প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণের মান হিসেবে ’গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৬’ অনুযায়ী বাংলাদেশ ষষ্ঠ স্থানে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী নারীর সকল ক্ষেত্রে ক্ষমতায়নে ১৪৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭২তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের চাইতে ভালো অবস্থান নির্দেশ করে।

দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পেশায় নারীদের সাফল্যজনক অংশগ্রহণ বেড়েছে। দেশের প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সাংবাদিকতায় যুক্ত রয়েছে বহু নারী। খেলাধুলায় বিশেষ করে উচ্চ পর্বত জয়েও এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশের নারীরা।

নারীর ক্ষমতায়নে ও জেন্ডার সক্ষমতা নির্ধারণে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৪টি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সংসদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। নারীর সামর্থ উন্নীতকরণ,নারীর অর্থনৈতিক প্রাপ্তি বৃদ্ধিকরণ, নারীর মত প্রকাশের মাধ্যম সম্প্রসারণ এবং নারীর উন্নয়নে একটি সক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টি করাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সরকারের।

বাল্যবিবাহ নামক ব্যাধি নারীর ক্ষমতায়নের পথে বড় বাধা। সংসদে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭ পাশ করা হয়েছে। বিলে বিধিমালা দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের জন্য জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং এর কার্যাবলী নির্ধারণের বিধান করা হয়েছে। বিধিমালায় স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে গণ্যমান্য ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাল্যবিবাহের খবর পেলে উক্ত কমিটি বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। তাছাড়া বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য নারীদের আত্মসচেতনতা এবং স্বনির্ভরতা প্রয়োজন। আর এই আত্মসচেতনতা এবং স্বনির্ভরতার জন্য প্রয়োজন নারীদের শিক্ষা–দীক্ষায় এগিয়ে যাওয়া। বর্তমানে মেয়েদের পড়া–লেখা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক। নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য সহায়ক কর্মসূচি চালু রাখা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যন্ত ছেলের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থী বেশি। গ্রামাঞ্চলে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার জন্য ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। মেয়েদের জন্য বিভিন্ন প্রকার মেধাবৃত্তির ব্যবস্থাও রয়েছে বর্তমানে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ ভাগ নারী শিক্ষক দ্বারা পূরণ করা হয়েছে।

গ্রামীন নারীরা যেন কোনো ভাবেই পিছিয়ে না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রেখে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের দুইকোটি নারী যাতে ঘরে বসে উপার্জন করতে পারে সেজন্য ’ইনকাম জেনারেটিং প্রোগ্রামের আওতায় ১৮টি ট্রেডে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে প্রশিক্ষণ নিতে আসা নারীদের যাতায়াত ভাতাও দেওয়া হচ্ছে। এ মন্ত্রণালয় থেকে নারীদের শুধু সেলাই–ফোঁড়াই নয়—মোবাইলে অর্থ উপার্জন। ড্রাইভিং, কম্পিউটার সহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে হাসপাতাল স্থাপনের অংশ হিসেবে প্রায় ১৬ হাজার ৫শ কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে নারীদের প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ’মেটার্নাল হেলথ ভাউচার স্কিম’ চালু করা হয়েছে। যার মাধ্যমে গর্ভধারিণী মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে নিরাপদ সন্তান প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে নারী ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করেছে।

ক্ষুদ্র আয়তনের একটি উন্নয়নশীল দেশ হয়েও বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সারাবিশ্বের নিকট প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার, দারিদ্র্য দূরীকরণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এবং নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন চোখে পড়ার মতো। তবু কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়ন করা যায়নি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের নেতৃত্ব বাড়াতে হলে নারীদের মধ্যে যে সংকোচ কাজ করে তা বর্জন করতে হবে। সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে হলে নারীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রীয় সহায়তার পাশাপাশি পারিবারিক সহায়তার বিষয়টিও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অতীব জরুরি। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বাল্যবিবাহ কিংবা নারী ও মেয়ে পাচার বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক বিধিবিধান প্রয়োগের উদ্যোগ কঠোরভাবে নেওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির জন্য দেশের সকল নারী যেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.