মূল্য পাচ্ছে না গ্রামীণ নারীর কৃষি কাজ

0
33

অপরাজয়া প্রতিবেদন : ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অসংখ্য কাজ গ্রামীণ নারীর। রান্না, গৃহপালিত পশুর দেখাশোনা, সন্তানের পরিচর্যা, ঘরদোর পরিষ্কার, কাপড়-চোপড় ধোয়া। এর পাশাপাশি গ্রামীণ নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ রয়েছে কৃষিকাজে। ঘরের কোণে শাকসবজি। সবুজে ভরে উঠে বাড়ির চারদিক। পুকুর পাড়ে বাহারি ফলের গাছ। এর সবটুকুই করছেন একজন নারী। এমনকি পুকুরে মাছের পরিচর্যাও। এ ছাড়া অনেক অঞ্চলেই নারীরা ধান কেটে ঘরে তুলে আনছেন এমন দৃশ্যও চোখে পড়ে হরহামেশায়। শুধু তাই নয়, বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান উৎপাদনের ২৫টি ধাপের মধ্যে অন্তত ২০টিতেই নারীর অবদান আছে। বিশ্বব্যাংকের এক জরিপের তথ্যমতে, দেশের কৃষিতে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ। গ্রামে কৃষিকাজে নারীদের অংশগ্রহণ কোনোভাবেই পুরুষের চেয়ে কম না। বরং, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষকে ছাপিয়ে নারীর অংশগ্রহণই বেশি। এসব নারীর কাজ দৃশ্যমান হলেও তার কাজের মূল্য থেকে যাচ্ছে অদৃশ্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীরা পারিবারিক শ্রম ছাড়াও কৃষি, মৎস্য, বনায়ন, গবাদিপশু পালনসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমে অবৈতনিকভাবে জড়িত। অথচ এসব অদৃশ্য শ্রমের আর্থিক মূল্য না থাকায় তাকে পরিবার ও সমাজে অবমূল্যায়িত হতে হয়। নারীর শ্রমকে পারিবারিক কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এ কাজ অবৈতনিক এবং তার জন্য কোনো আর্থিক মূল্য পান না নারীরা। যদি নারীর অবমূল্যায়িত কাজের অংশ জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ করা হতো, তাহলে জাতীয় উৎপাদনে নারীর অবদান ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হতো।

শ্রমশক্তি জরিপের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট ১ কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে শতকরা ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী। যারা মূলত কৃষিকাজ, হাঁস-মুরগি পালন, পশুপালন এবং মাছ চাষের মতো কৃষিসংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষিখাতে নারীর এই অংশগ্রহণকে পারিবারিক শ্রম হিসেবে গণ্য করা হয়, যা সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং আর্থিক মূল্যহীন। গবেষণা থেকে জানা যায়, কেবলমাত্র বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান উৎপাদনের ২৫টি ধাপের মধ্যে অন্তত ২০টিতেই নারীর অবদান রয়েছে।

ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইনেবল রুরাল লাইভলিহুডের (সিএসআরএল) ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ ধরনের কৃষি খাতে ১৭ ধরনের কাজেই গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। সেই হিসাবে, কৃষি খাতের ৮০ শতাংশ কাজই করছেন নারী। ফসলের প্রাক-বপন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বীজ সংরক্ষণ, ফসল তোলা, প্রক্রিয়া ও বিপণনের কাজও রয়েছে এর মধ্যে। কিন্তু এত কাজের পরও নারীদের এসব কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই।

শুধু তাই নয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কাছেও কৃষি কাজে জড়িত নারীদের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই! নারীরা কৃষক বলেও চিহ্নিত নন। খোদ এই অধিদফতরের কাছ থেকেও নারীর অবদান নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তবে একাধিক তথ্য মতে, গত এক দশকে অবৈতনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিকের ৫০ লাখই নারী।

দেশে প্রথমবারের মতো ১৯৯৫-৯৬ সালে শ্রম জরিপে নারীকে কৃষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কৃষিতে নারী শ্রমিকের সংশ্লিষ্টতার এটিই ছিল প্রথম স্বীকৃতি। আর ২০০৫-০৬ সালের শ্রম জরিপে বলা হয়, ১৫ বছরের ওপরের জনশক্তির ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। ওই জনশক্তির ৪২ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৮ শতাংশ নারী। এসব নারীরা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পূর্বের ওই জরিপ অনুযায়ী, কৃষিতে নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি।

২০০৮ সালে করা বিশ্বব্যাংকের আরেক জরিপের তথ্য থেকে জানা গেছে, দেশের কৃষিতে নারীর অবদান শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ। তবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারী শ্রমিকের অবদান অন্তভুর্ক্ত করা হয়নি, নেই কোনো পৃথক পরিসংখ্যানও।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর মজুরি ও স্বীকৃতিহীন কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নিরূপণের উদ্দেশ্যে এবং জিডিপির মানদণ্ডে তার তুলনা করার জন্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন জরিপ করে। ‘জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান নিরূপণ’ শীর্ষক সেই গবেষণায় দেখা যায়, একজন নারী মজুরি ছাড়া প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮ ঘণ্টা কাজ করেন, অন্যদিকে পুরুষ করে আড়াই ঘণ্টা। একজন নারীর মজুরিহীন কাজের সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি, যা জিডিপিতে যোগ হয় না। পুরুষের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ২ দশমিক ৭টি।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কৃষি ক্ষেত্রে কেবল ধান উৎপাদনে ২৫টি ধাপের মধ্যে অন্তত ২০টি কাজ নারীরা এককভাবে করছে। বাকিগুলোর পুরুষদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে করলেও নারীরা যতটুকু বিনিয়োগ করে কৃষিকে উন্নত করছেন, সমৃদ্ধ করছেন, তারা সেই স্বীকৃতি পাচ্ছেন না।’

নারীরা মৎস্য, গবাদিপশু লালন-পালনের মতো বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু এসব শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্য না থাকায় পরিবারে নারীর মতপ্রকাশ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার পাচ্ছে না বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটির সচিবালয় সমন্বয়কারী ফেরদৌস আরা রুমী।

তিনি বলেন, এ জন্য প্রয়োজন নারীর অদৃশ্য শ্রমের আইনি স্বীকৃতি এবং মূল্যায়ন, যা তাকে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে নেবে।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শার্মিন্দ নীর্লমি বলেন, কৃষিতে নারীর কাজকে ঘরের কাজ বলেই ধরে নেওয়া হয়েছে। অনেকটা ‘এক্সটেনশন অব ঘরের কাজ’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, কৃষিতে পুরুষের কাজের হার কমেছে এবং নারীর কাজ বেড়েছে। কিন্তু তাতে করে কৃষির উৎপাদনে ঘাটতি আমরা দেখিনি। তাহলে নারী কেন তার কাজের মূল্য পাবে না?— প্রশ্ন রাখেন তিনি।

দেশের শ্রমশক্তির অংশ হতে পারেন— ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী এমন নারীর ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ করেন। এদের মধ্যে ৮২ শতাংশ ‘আনপেইড ফ্যামিলি লেবার’, যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় ‘ওউন অ্যাকাউন্ট ওয়ার্কার’। অর্থাৎ, তারা কাজের কোনো পেমেন্ট বা মজুরি পান না।

এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যম জনমত তৈরি করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংবাদে প্রান্তিক গ্রামীণ নারীর চিত্র খুব কমই তুলে ধরা হয়। প্রিন্ট বা ব্রডকাস্ট— দুই ধরনের গণমাধ্যমেই গ্রামের খবরের জন্য নির্ধারিত পাতা বা নির্ধারিত অনএয়ার সময়ে গ্রামীণ নারীর সংগ্রামকে খুব বেশি দেখানো হয় না। অথচ মানুষের কাছে গ্রামীণ নারীর প্রকৃত অবস্থা সর্ম্পকে জানাতে সচেতনতা তৈরির বিকল্প নেই।

কৃষিতে নারীর অবস্থা: দেশে প্রথমবারের মতো ১৯৯৫-৯৬ সালের শ্রম জরিপে নারীকে কৃষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কৃষিতে নারী শ্রমিকের সংশ্লিষ্টতার এটিই ছিল প্রথম স্বীকৃতি। আর ২০০৫-০৬ সালের শ্রম জরিপে বলা হয়, ১৫ বছরের ওপরের জনশক্তির ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। ওই জনশক্তির ৪২ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৮ শতাংশ নারী। এসব নারীরা প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ কিংবা সরাসরি কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পূর্বের ওই জরিপ অনুযায়ী কৃষিতে নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি।

২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংকের আরেক জরিপের তথ্য থেকে জানা গেছে, দেশের কৃষিতে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ। তবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারী শ্রমিকের অবদান অন্তভুর্ক্ত করা হয়নি। তাদের নিয়ে নেই আলাদা কোনো পরিসংখ্যানও। কৃষি ক্ষেত্রে কর্মরত নারী শ্রমিকেরা একই পরিশ্রম করে মজুরি পায় অর্ধেক।

কৃষকদের নিয়ে কাজ করা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হাতে কৃষাণীদের নিয়ে কোনো তথ্য নেই। খোদ এই অধিদফতরের কাছ থেকেও নারীর অবদান নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তবে একাধিক তথ্যমতে, গত এক দশকে অবৈতনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের ৫০ লাখই নারী। যাদের ৭৭ শতাংশ কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ নারী। তাদের ৮৬ শতাংশই বাস করেন গ্রামে। আর গ্রামীণ এসব নারী দিনের মোট সময়ের ৫৩ শতাংশ সময় ব্যয় করেন কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে, যেখানে এসব কাজে পুরুষদের সময় ব্যয় হয় ৪৭ শতাংশ। দেশের খাদ্য সংকট মোকাবিলায় মোট নারী শ্রমশক্তির শতকরা ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ নারী কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকলেও আর্থসামাজিক অবস্থান পুরুষের তুলনায় নারী দারিদ্র্যসীমার প্রায় ৪৩ শতাংশ নিচে বাস করে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শ্রমশক্তির জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট এক কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে শতকরা ৭৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৯২ লাখ নারীই কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ ও সামাজিক বনায়নের সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ কৃষি মজুরিভিত্তিক জরিপ থেকেও জানা যায়, একজন পুরুষ যদি কৃষি মজুরি হিসেবে পান ১০০ টাকা, সেখানে নারী পেয়ে থাকেন ৭৫ টাকা। পরবর্তী সময়ে এই বৈষম্য কমলেও তার গতি খুবই ধীর।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইসমত আরা বেগম বলেন, কৃষিকাজ বলতে কেবল ক্ষেত-খামারের কাজ নয়, শস্য উৎপাদন, হাস-মুরগি-গরু-ছাগল পালন এবং মৎস্য উপদানকেও বোঝায়। সে হিসেবে কৃষিখাতের ২১টি কাজের মধ্যে ১৭টি কাজই নারীরা করে থাকেন। কিন্তু তাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। একইসঙ্গে সরকারের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় যে ১০০ দিনের কাজের কর্মসূচি, সেখানেও গ্রামীন নারীরা কাজ করছেন। গ্রামের যে রাস্তা-ঘাট তৈরির কাজ, সেখানেও রয়েছে তাদের অংশগ্রহণ। কিন্তু সেখানেও রয়েছে মজুরি বৈষম্য। কাগজে-কলমে সমান মজুরির কথা থাকলেও নারীদের দেওয়া হচ্ছে কম।

আবার কৃষিতে জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ধান লাগানো, রোপন করা থেকে ধান মাড়াই, বাছাই-প্যাকেটজাত করা— সব জায়গায় পুরুষের চেয়ে নারীর অংশগ্রহণই বেশি। একইসঙ্গে গবাদি পশু, মাছ পালনের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও নারীর অংশগ্রহণ বেশি। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ‘মার্কেটিং’য়ে নারীর অবদান কম উল্লেখ করে এর কারণ হিসেবে অধ্যাপক ইসমাত আরা বলেন, এখানেই পুরুষশাসিত সমাজ ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দেখিয়ে নারীদের দমিয়ে রাখে। তারা নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেয়নি বলেই আমি মনে করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.