ভুতুরে গ্রাম ও ভুত আনন্দ

0
132

লিখি জামান রোজালিন :

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রাম। নামটা ঠিক জানা নেই তবে নোঙ্গরপুর হতে পারে। নামটা ভারী অদ্ভূত। অনেক অনেক বছর আগে কোলকাতায় একটি বড়লোক বাড়ী ছিল। ঐ বাড়ীর মালিক সরকারী চাকুরী করতেন। তার একটি ছেলে ছিল নাম আনন্দ। আনন্দ তার ঠাকুরদার সঙ্গে সময় কাটাতো। সে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। গ্রীষ্মের ছুটিতে সে তার ঠাকুদার সঙ্গে নোঙ্গরপুরে মামা বাড়ীতে বেড়াতে গেল। এটা ছিল মামা বাড়ীতে তার প্রথমবার যাওয়া।

মামা, মামী, দিদার সঙ্গে সে জীবনে প্রথমবার দেখা করলো। সে তার স্বর্গীয় দাদুর গল্প দিদার কাছে শুনলো। তার দাদুর একটি আলাদা ঘর ছিল। সেই ঘরে তিনি ছাড়া আর কেউ ঢুকতোনা। সে ঘরে দাদু যে ঠিক কি করতো তা কেউ জানতোনা। এখন ঘরটি তালা বন্দী। মাঝে মাঝে ঘরটি থেকে বিকট শব্দ আসে। সবাই বলে ঐ ঘরে নাকি তার প্রয়াত দাদুর আত্না বন্দী আছে। কেউ ভয়ে ঘরটির তালাবদ্ধ দরজাটি আর খোলেনা।

দাদুর গল্প শুনতে শুনতে আনন্দ ঘুমিয়ে পড়ে। সেই রাতে ভোরের দিকে সে সপ্নে দেখে, সে মারা গিয়েছে। সে তার দাদুর সাথেই চলে গেল শান্তির প্রতীক হিসেবে। বিদায় জানালো পৃথিবীকে।

হঠাৎ তার ঘুম ভেঙ্গে গেলে, সে আৎকে উঠে বসে। কথায় বলে, ভোরের সপ্ন নাকি সত্যি হয়। ঠিক তাই হলো। যাইহোক, ওসব কথা পরে হবে। এখন আগের কথায় ফিরি। সে ঘুম থেকে উঠে ভয়ে কাঁপতে লাগলো। স্বপ্নের কথা শুনে তার দিদা বললো, ভয় পেয়োনা আনন্দ! ওসব তোমার কল্পনা।

তারপর সে নাস্তা খেয়ে, মামার সঙ্গে গ্রামটা ঘুরে দেখতে চাইলো। সে নিজে, মামা ও মামততো ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরতে বেরুলো। সে প্রথমবার গ্রামে এসেছে। গ্রামের নামটাও অদ্ভুত। গ্রামে নানা অদ্ভুত জায়গাও আছে। সে মামততো ভাই সুধীনের কাছে গ্রাম সম্পর্কে জানলো। গ্রামের সব অদ্ভুত জায়গাগুলোর মধ্যে তার আগ্রহ জাগলো পুরোনো জমিদার বাড়ীর ভেতরকার পুকুরটার প্রতি।

সবাই বলে, ওই বাড়ীর জমিদার নাকি খুব অত্যাচারী ছিলেন। তিনি কারণে, অকারণে মানুষদের অত্যাচার করে, হত্যা করতেন। ওই অত্যাচারীত আত্নারা নাকি, এখন প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ওই বাড়ীতে ঘুরে বেড়ায়। যেই ওই বাড়ীতে যেতো আর ফিরে আসতোনা। জমিদার তাদেরকে মেরে ওই পুকুরটায় ফেলে দিতেন। তাই ওই আত্নাদের আকর্ষণ, ওই পুকুরের প্রতিই বেশী। আনন্দের এসব অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা শুনতে ভালো লাগে। সে এগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করে।

সে তার মামার সাথে যেহেতু গ্রাম ঘুরে দেখতে বেরিয়েছে, তার মামাও তাকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। মরা নদীর তীরে, ফসলী ক্ষেতে, গ্রামের পাঠচালা, কলেজ, মন্দির আরো কতো জায়গা! এসব জায়গা খুব সুন্দর তবুও আনন্দের মন পড়ে আছে ওই জমিদার বাড়ীর ভুতুরে পুকুরে। মামা আনন্দকে শুধান, ওসব বাজে কথা, কিছুই সত্যি নয়, সুধীন মজা করে বলেছে। তবুও আনন্দের বিশ্বাষ হয়না। সন্ধ্যা হয়ে য়ায়। তারা বাড়ীতে ফেরে।

সে ঠাকুরদা, দিদা ও মামীর সঙ্গে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে। তবুও সে তার দাদুর নিজস্ব ঘর, ওই পানাপুকুর, জীবন, মৃত্যু ইত্যাদি নিয়েই ভাবছে। আনন্দ খুবই দুরন্ত প্রকৃতির ছেলে। তার পরিকল্পনা ছিল মামা বাড়ীতে এসে, খুব মজা করবে। কিন্তু তা আর হলে কই! আসার দিন থেকেই ওসব ভুতুরে ভাবনার জিনিশগুলো নিয়েই পড়ে আছে। সে ছোট মানুষ, তাই বুঝতে চাইছেনা। খালি জমিদার বাড়ীতে যেতে চাইছে।

গত ৩৭ বছরে ওখানে কেউ যায়নি। ১৫৩ বছরের পরিত্যক্ত বাড়ী। এখনো কেউ যদি ভুলে চক্রে যায়, আর ফিরে আসেনা। আনন্দ এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে, ভাবনার গভীর সাগরে তলিয়ে য়ায়। ভাত খেতে চায়না। অদ্ভুতসব সপ্ন দেখে। কি করতে এসেছিল আর কি করছে!

তারপর একসময় তার গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষ হয়ে যায়। সে ঠাকুরদার সঙ্গে কোলকাতায় ফিরে আসে। এসেও নিস্তার নেই, মাথায় একই চিন্তা। পড়া শোনায় মন বসেনা। ধীরে ধীরে আনন্দ বড় হয়। এখন সে ক্লাস ফাইভে পড়ে। এখন মানষিক ভাবে সে অনেকটাই সুস্থ। সদ্য বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো। হাতে লম্বা অবসর। সে গল্পের বই পড়ে। তার ঠাকুরদাও গল্প শোনায়। বই পড়তে পড়তে আবার সে চলে যায় সেই পুরোনো ভাবনায়, জীবন মৃত্যুর ভাবনায়।

সুস্থ দুরন্ত ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে চিন্তা করতে করতে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার মন পড়ে আছে ওই ভাবনায়, আত্নাদের ভাবনায়, মৃত্যুর ভাবনায়। যে একদিন স্বপ্নে দেখেছিল, সে তার দাদুর আত্নার সাথে মিলে পৃথিবীকে বিদাই জানিয়ে ছিল। তাই হলো। তাদের আত্না পৃথিবীকে বিদায় দিল তবে চিরকালের জন্যে নয়। সে তার দাদুর সাথে স্বর্গ দেখলো, নরক দেখলো। মানুষের চিন্তা-ভাবনা, আশা দিয়ে তৈরী পাতার গাছ দেখলো।

সেই গাছের প্রতিটি পাতা, প্রতিটি মানুষের জন্ম, মৃত্য, আশা, চিন্তা-ভাবনার সাথে জড়িত। একটি মানুষ মরে গেলোতো, ঐ গাছ থেকে একটি পাতা ঝরে পড়লো। যেখানে সব মৃতদের আত্না হাঁটে, সেখান দিয়ে তার ও তার দাদুর আত্নাও হাঁটলো। তবে আনন্দ মৃত নয়, জীবীত। স্বর্গ, নরক সব দেখে আনন্দের আত্না পৃথিবীতে আনন্দের দেহের ভিতর ঢুকলো। সে আবার আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলো।

এরই মধ্যে সে ক্লাস সিক্সে উঠলো। আবার পড়া শোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে সে আবার বেশ কিছুদিনের ছুটি পেল। ঘুরতে গেল দাদু বাড়ী নোঙ্গরপুর। তবে এবার সাথে ঠাকুরদা নেই। সে একা। সে এখন মোটামুটি বড় হয়ে গলেও মামা বাড়ীতে তার আদর যত্নের কমতি হলোনা।

যেহেতু সে তার দাদুর আত্নার সাথে স্বর্গ নরক ঘুরে এসেছে, তাই সে সাহস করে তার দাদুর নিজস্ব ঘরের বহু বছর ধরে বন্ধ দরজাটি খুলল। মুক্তি পেল তার দাদুর আত্না। বন্ধ হলো বিকট শব্দ। এখন আর ঘরটির মধ্যে বিশেষ কিছু রইলোনা। দাদুর আত্না আনন্দের কাছাকাছি ঘুরতো।

তার খুব ইচ্ছে ছিল জমিদার বাড়ীর পানা পুকুর দেখবে। তার শহরে ফেরার সময় হয়েছে। সে স্নানাদী সেরে মধ্যাহ্ন ভোজ করে ট্রেইন ধরবে। সে নদীতে স্নান করতে গিয়েছে। সাথে তার মমততো ভাই সুধীন। দু’জনেই পানিতে ডুব দিল। মামততো ভাই সুধীন উঠলেও আনন্দ আর উঠলোনা।

কোন কারণে সে মারা গেল। তার আত্না অতৃপ্ত। তার জমিদার বাড়ীতে গিয়ে পানা পুকুর দেখার ইচ্ছা আর পূরণ হলোনা। এখন তার দাদু ও তার আত্না মিলে গ্রামে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে। গ্রামে ভয়ে আর কোন মানুষ থাকলোনা।

গ্রাম পরিত্যক্ত হলো। কিছুদিন পর আনন্দের আত্না তার দাদুর আত্নার সাথে মিলে ঐ জমিদার বাড়ীর পানাপুকুরের অতৃপ্ত প্রতিশোধ পরায়ণ ভুতুরে আত্নাদের তাড়িয়ে নিয়ে শান্তির প্রতীক হিসেবে গ্রামবাসীদের মুক্তি দিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানালো।

সত্যি হলো সেই প্রথম দিনের ভোর রাতের সপ্ন। বর্তমানে গ্রামটির কোন অস্তিত্ব নেই কারণ, সেটি এখন একটি শান্তিপূর্ণ শহর হয়ে গিয়েছে, নাম তার আনন্দপুর।

শেষ হলো ভুতুরে গ্রাম ও আনন্দ ভুতের কাহিনী।

(আমার বয়স সাড়ে দশ। আমি এবার সমাপন পরীক্ষার্থী। আমার নিজের আইডি নেই তাই, বাবার এখান থেকে পোষ্টটি দিলাম। আপনারা পড়বেন। আমার জন্য দোয়া করবেন। লেখাটি কেমন হয়েছে জানাবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.