নয়জন বীর মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত মা বেগম আশরাফুন্নিসা

বেগম আশরাফুন্নিসা
বিজ্ঞাপন

বেগম আশরাফুন্নিসা নয়জন বীর মুক্তিযোদ্ধার জননী। তাঁর সাত পুত্র এবং দুই কন্যা বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই নয়জনের মধ্যে চারজন মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য বীরত্বসূচক পদকের অধিকারী। কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম, এক সন্তান-বেলাল ও বাহার ইউসুফ বীরবিক্রম, দুই সন্তান বীরপ্রতীক। এই বীরপ্রতীক এরা পেয়েছেন দু’বার করে। তিনি নোয়াখালীর দক্ষিণ জয়পুরের মেয়ে। বাবা মো. ইউনুস মিয়া ছিলেন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বড় কর্মকর্তা। তাঁর দুই মেয়ে। আশরাফুন্নিসা ও ছোট মেয়ে মরিয়ামুন্নিসা। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন মরিয়ামুন্নিসারই মেয়ে। স্বামী মহিউদ্দিন আহমেদের বাড়ি বৃহত্তর ময়মনসিংহের (বর্তমান নেত্রকোনা) পূর্বধলা থানার কাজলা গ্রামে। মহিউদ্দিন আহমেদ পড়াশোনা করেছেন আনন্দমোহন কলেজে। ডিস্টিংশান নিয়ে এন্ট্রান্স (এসএসসি সমমান) পাস করেছিলেন।

তবে অল্প বয়সে বাবা মারা যাওয়ায় পড়াশোনা শেষ না করেই রেলের চাকরিতে যোগ দিতে হয়েছিল। আসামের বদরপুর রেলস্টেশনে চাকরিকালীন আশরাফুন্নিসার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের ১১ সন্তানের মধ্যে কর্নেল আবু তাহের তৃতীয়। আট ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে এক ছেলে সন্তান—ঝন্টু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন মারা যায়। বাকি ১০ সন্তানকে শুধু লেখাপড়া নয়, উদ্যমী ও সাহসী করে গড়ে তুলেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তাঁর সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধে কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম জীবনপণ যুদ্ধ করেন, চার সন্তান বীরত্বসূচক খেতাব লাভ করেন।

ছোটখাটো শ্যামলা রঙের আটপৌরে মহিলা যাঁকে কেন্দ্র করে আবর্তিত তাঁর ১১ সন্তান আর স্বামী। এক সন্তানের অকাল মৃত্যুর পর বাকি ১০ সন্তানকে নিয়ে তাঁর জীবনযুদ্ধ। ১০ সন্তানের একটি সংসার রীতিমতো একটা প্রতিষ্ঠানের মতো করে গড়ে তোলেন আশরাফুন্নিসা। স্টেশনমাস্টার স্বামী নীরবে নিঃশব্দে স্ত্রীর সকল কর্মযজ্ঞের সমর্থক ছিলেন। যিনি সন্তানদের গড়ে তুলেছেন আত্মনির্ভরশীলতা আর দেশপ্রেমের মন্ত্র দিয়ে। কঠোর নিয়মানুবর্তিতা প্রশিক্ষণ, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, সংসারের কায়িক শ্রমে অভ্যস্ততা—এসব প্রস্তুতি শৈশব থেকে সন্তানদের দিয়েছে বৃত্ত ভাঙার সাহস।

বিজ্ঞাপন

‘আমাদের জীবন শুধু আমাদের নিজের জন্য নয়, এ জীবনের ওপর দাবি আছে আশেপাশের চেনা-অচেনা মানুষেরও’— আশরাফুন্নিসা, তাঁর এ বিশ্বাস, ছেলেমেয়েদের মধ্যে সঞ্চালিত করেছেন বারবার। তিনি ছেলেমেয়েদের ভেতরে বোধ তৈরি করেছেন মানুষের কল্যাণের দিকে, সাধারণ মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখের দিকে। এমন একটা বোধ এরা যেন কেউ একা নয়, পুরো পরিবার মিলে যেন একটা যৌথ ব্যক্তিত্ব। পরিবারের সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে, একত্রে নেমে পড়েছে দুর্ধর্ষ বিপ্লবে আর সবার ভেতরে আলো জ্বালিয়েছেন মা আশরাফুন্নিসা।

২০১০ সালের ২ আগস্ট সাক্ষাৎকারেঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিভাগের ডিন ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে ঘিরে তাঁদের সকল কাজের প্রেরণাদায়ী মা আশরাফুন্নিসার কথা। মেজ বউ লুৎফাতাহের, সন্তান ডালিয়ার গল্প শুনে বিস্মিত হয়ে ভেবেছি সন্তানদের কীভাবে তিনি প্রতিষ্ঠানের মতো করে বড় করে তুলেছেন। প্রদীপ্ত করেছেন আত্মবিশ্বাস, দেশের প্রতি দায়িত্ব আর মমতায়। নিজ সন্তানদেরই শুধু নয়, যুদ্ধ চলাকালীন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রিত ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে গ্রামে চালু করেছিলেন বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। প্রতিদিনের সংসারে থেকে সাধারণ একজন মা পিঠাপিঠি ১০ সন্তানকে গড়ে তোলেন স্বতন্ত্র, স্বাধীন, দায়িত্বশীল সংগঠক আর দেশপ্রেমের প্রেয়ণায়। বীরউত্তম সেক্টর কমান্ডার আর তিন বীরউত্তম-বীরপ্রতীক সন্তানসহ ৯ সন্তানই একাত্তরে রণাঙ্গনে অমিততেজে যুদ্ধ করেছেন ১১ নম্বর সেক্টরের ব্রাদার্স প্লাটুনে। আশরাফুন্নিসার সন্তানরা—কর্নেল তাহের, সেক্টর কমান্ডার-১১, বীরউত্তম, আবু ইউসুফ বীরবিক্রম, মো. ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল-বীরপ্রতীক, মো. সাখাওয়াত হোসেন বাহার-বীরপ্রতীক, আবু সাঈদ, আনোয়ার হোসেন, ডালিয়া আর জুলিয়া।

সেক্টর কমান্ডার, বীরউত্তম সন্তান কর্নেল তাহের আমৃত্যু যোদ্ধা, যিনি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও তৃতীয় বিশ্বের সেনাবাহিনীকে গণমুখী করার চেষ্টায় যুদ্ধ করেছেন স্বাধীন দেশে। দেশ আর মায়ের ভালোবাসায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভয়ভীতি উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে নজরবন্দি তাহের দেশকে মুক্ত করার সংকল্প নিয়ে পাকিস্তান সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছান। দায়িত্ব নেন শেরপুর বকশীগঞ্জ, জামালপুর, রৌমারীসহ বিশাল আয়তনের ১১নং সেক্টরের।

১১নং সেক্টরের দায়িত্ব নেওয়ার পর চিলমারী অপারেশনের সাফল্য কর্নেল তাহেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কামালপুর হয়ে দাঁড়ায় তাঁর পরবর্তী অন্যতম টার্গেট। কামালপুর ঘাঁটিকে দখল করার নানা পরিকল্পনা করতে থাকেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় এক মাস পূর্বে ১৪ নভেম্বর ভোররাতে অপারেশন শুরু করেন। সেদিনের অপারেশনে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সাথে উপস্থিত ছিলেন তাহেরের পুরো পরিবার। দুই সন্তান বেলাল, বাহার, তাঁদের স্কাউট টিম নিয়ে থাকতেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পজিশনে।

ছেলে আবু ইউসুফ ও ছেলে আনোয়ার, মেয়ে ডালিয়াও উপস্থিত ছিলেন কামালপুর যুদ্ধক্ষেত্রে। তিনটা রেঞ্জে একই সঙ্গে চলে তুমুল ফায়ার। এমএমজি, ভারী মেশিনগানের বিকট শব্দ আর আগুনের হলকায় ছেয়ে যায় কামালপুর, ধানুয়া কামালপুর, উঠানিপাড়া, হাসিরগাঁওয়ের রাতের আকাশ, বাতাস। সকালের দিকে কামালপুরের অনেকটা ভেতরে ঢুকে পড়ে মুক্তিবাহিনী। ভয়াবহ গোলাগুলির মধ্যে পড়ে একই সাথে পাকিস্তানি বাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধা উভয়ই নিহত হচ্ছে একের পর এক। উঁচু ঢিবিতে বসে থাকা তাহের নামতে উদ্যত হওয়ার মুহূর্তেই সেখানে একটি শেল ড্রপ হয়। মর্টারের শেলের আঘাতে একটি পা হারিয়েও রক্তাক্ত কমান্ডার তাহের সহযোদ্ধাদের বলেন, ‘যুদ্ধ চালিয়ে যাও, তোমরা ফ্রন্টে ফিরে যাও, যুদ্ধ চালিয়ে যাও… মনে রেখ কামালপুরকে মুক্ত করতে হবে। আমি মরবো না, খুব দ্রুত চলে আসছি তোমাদের কাছে। পাকিস্তানিদের তোমাদের হারাতেই হবে।’ এই দৃঢ় মানসিকতা আত্মপ্রত্যয় সম্ভব হয়েছিল মা আশরাফুন্নিসার প্রত্যক্ষ সমর্থন ও শিক্ষণের ফলে। দেশের প্রতি, মাটির প্রতি, ভালোবাসার ঋণ শোধ করেন তাঁর সন্তানেরা জীবন দিয়ে। লাতিন আমেরিকার নোবেল বিজয়ী গাব্রেরিয়াল গার্সিয়া মার্কেজের বুয়েন্দিয়া পরিবারের মতো মা আশরাফুন্নিসার সন্তানরা অপূর্ব বীরত্ব, বিপ্লব ও দুর্জয় সাহসিকতায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করবে, দেশপ্রেম উৎসারিতহবেআমাদেরগভীরে।

গড়ন ছোটখাটো, রঙ শ্যামলা—যেনপলিমাটির এই বাংলাদেশের অকৃত্রিম একজন মা আশরাফুন্নিসার ছেলেমেয়েদের সাহস ও উদ্যম দিয়ে গড়ে তোলার একটি বাসনা ছিল শুরু থেকেই। তাই তাঁর সন্তানরা শৈশব থেকেই নতুন কিছু করার প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ বোধ করতো। বড় মেয়ে শেলীর লেখাপড়ার প্রতি আশরাফুন্নিসা ও স্বামীর মনোযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। মেয়েদের সেরা সব স্কুল, যেমন- সিলেটের সরকারি গার্লস স্কুল, চট্টগ্রামের খাস্তগীর গার্লস স্কুল এবং ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুল ও পরে মমিনুন্নেসা কলেজে শেলী লেখাপড়া করেন। ওই কলেজের ছাত্রী সংসদের ভিপি ছিলেন তিনি। সেই সময় শেলী শুধু ছাত্র ইউনিয়নেরই নেত্রী ছিলেন না, নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ অঞ্চলে সক্রিয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের সাথেও তাঁর যোগাযোগ ছিল। এসব কাজে আশরাফুন্নিসা ও তাঁর স্বামীর সায় ছিল। পাকিস্তান আমলে ওই নেতৃবৃন্দের অনেকে তাঁদের রেলের ছোট কোয়ার্টারে এসে থাকতেন। তিনি নিজ হাতে তাদের খাওয়াতেন, দেশের নানা বিষয় নিয়ে কথাও বলতেন। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে তাদের ছোট সন্তানদের ওপর।

ছেলেমেয়েদের মধ্যে তৃতীয় হলেও তাহেরই ছিলেন সেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। স্কুলজীবন থেকেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতির সাথে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। সিলেটের এমসি কলেজে পড়ার সময় তা আরও পরিণত হয়। ছুটি শেষে কলেজ হোস্টেলে যাওয়ার আগে মা আশরাফুন্নিসা তাহেরকে বলে দিতেন ‘আউট বই’ আনার জন্য। বাড়িতে কোনো কাজের মানুষও রাখা হতো না। এতগুলো ছেলেমেয়ের ভাবনা-চিন্তা, সংসারের কাজ—এসব সামলে বই পড়ার সময় বের করতেন তিনি। ভাগনা দিহীর মাঠ এ বইটিতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক সিধু ও কানহুর বীরত্বগাথা, জীবনদান তাঁর মনেও গভীর ভাবাবেগের সৃষ্টি করতো। মা বলতেন, ছোটবেলা থেকেই তাহের ছিলেন খুবই সাহসী। তাহের পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন পূর্ববাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখেই। একটি জনযুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে, এই প্রতীতি তাঁর ছিল।

Advertisement