নারী জীবনে মৃৎশিল্প

0
25

অপরাজয়া ডেস্ক :বাংলাদেশের পাল বা কুমার সম্প্রদায় আমাদের দেশে মৃৎশিল্পী হিসেবে পরিচিত। দেশের প্রত্যেকটা পালপাড়ায় গেলে দেখা যাবে নারীরা সবসময় ব্যস্ত। সংসারে ছেলেমেয়ে লালন থেকে প্রতিমা তৈরি বা তৈজসপত্র তৈরির পুরো কাজটাই তাদের করতে হয়। মধ্যরাত অবধি তাদের চলে মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে। মৃৎশিল্পের প্রধান কাজটাই হলো মাটি তৈরি, মাটি বানানো। এক কথায় বলা যায় প্রতিমা, বা তৈজসপত্র তৈরি করতে মাটি তৈরি করা। মাটি ছেনার যে কঠিন কাজটা তা নারীরাই করে। তারপর প্রতিমায় মাটি বসানোর পর তাতে খড়ি লাগানোর কাজটাও তারা করে। কিন্তু চক্ষুদানের কাজ নারীরা করে না। সেটা পুরুষ করে। মহিলারা করলে অকল্যাণ হবে। এমন কথা এখনো প্রচলিত আছে। আশির দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত তৈজসপত্র নিয়ে পাল সম্প্রদায়ের লোকজন বহু দূরের গ্রামে যেত। যাকে গাওয়ালে যাওয়া বলে। গাওয়ালে যাওয়ার আগে রাতভর কাজ করত নারীরা। তারপরও নারীরা সুবিধা বঞ্চিত থাকে সবসময়। বিধবা হলে তার অবস্থা আরো খারাপ। পুরুষের সঙ্গে কথা বললে শ^শুর-ভাসুরের কথা শুনতে হয়, বাজারঘাট করলে আরো দুর্নাম। প্রতিমা তো সে বানাতে পারবে না। তাহলে সে চলবে কীভাবে? তার কাছে অন্য কেউ প্রতিমার বায়না দেয় না সে যতই দক্ষ হোক। আমাদের দেশের কুটির শিল্পে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও অবদান অনস্বীকার্য। শহর, বন্দর ও গ্রামে এসব নারী অত্যন্ত ধৈর্য এবং নিষ্ঠার সঙ্গে সুনিপুণ হাতে কুটির শিল্পজাত পণ্য তৈরি করে আমাদের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের পাশাপাশি মৃৎশিল্প আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। প্রাচীনকাল থেকে এই বাংলায় মৃৎশিল্পের কাজই চলে। এ দেশের নারীরা এ কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু তার সে নাম নেই। সম্মান নেই। আধুনিককালে এই ক্ষেত্রে নারীর অবদান কোনোভাবে অস্বীকার করার উপায় নেই। মৃৎশিল্পের সঙ্গে এই শিল্পকর্মে যারা জড়িত তাদের পাল, কুমার বা কুম্ভকার বলা হয়। বর্তমানে তাদের মৃৎশিল্পী হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এই শিল্পকর্মের ধারাটাই এমন একজন পুরুষের সঙ্গে একজন নারী না থাকলে কাজ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। নারীর ধৈর্য ও শিল্প চিন্তা পুরুষের চেয়ে গুরুত্ববহ বলেই মৃৎ শিল্পটা বেশিরভাগই নারী নির্ভর। তবে সে গুরুত্ব নারী কখনোই পায় না। জনসম্মুখে তার কাজের স্বীকৃতি নেই একদম। এর ব্যত্যয় লক্ষ করা যায় না বললেই চলে।

এসব শ্রমজীবী নারীর মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগই অশিক্ষিত, বাকি ১০ ভাগ সামান্য লেখাপড়া জানে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুধু পারিবারিকভাবে তারা এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। জীবিকা বলতে যা বুঝায় তা মৃৎশিল্পের কাজ। নারীরা এ শিল্পের প্রাণশক্তি। অন্যান্য শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মতো মৃৎশিল্পের নারীরাও সম্মান ও সব ধরনের বৈষম্যের শিকার। মজুরি তার মধ্যে অন্যতম। যতই বেচাকেনা হোক কোনো শিল্পী তার স্ত্রীকে হাত খরচটিও দেয় না। এটা পাল পাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে। শীতে সরিষার তেল ছাড়া আর কোনো প্রসাধন তার জন্য বরাদ্দ নেই। পুরুষের সমান কাজ করেও তারা একজন পুরুষ শ্রমিকের মজুরির কিছুই তার প্রাপ্য নয়। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তিতে এসব মৃৎশিল্পীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে দৃষ্টি দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ মৃৎশিল্প একটি উন্নয়নশীল ও সম্ভাবনাময় খাত। জীবন ও জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা নারীদের এতটুকু অবসর নেই। নেই কোনো বিনোদন, নেই ভালো খাবার-দাবার। সংসারের কঠিন ঘানি টানা এসব শ্রমজীবী নারীর সন্তানরা ভালো স্কুলে পড়তে পারে না। ছোট্ট দুধের শিশুকে নিয়েও নারীকে কাজে বের হতে হয়। এ চিত্র আরো করুণ। এসব খেটেখাওয়া নারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্য সচেতন নয়। অথচ বর্তমানে এই শিল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ব্যাপক চাহিদা লাভ করেছে। বর্তমানে প্লাস্টিক সামগ্রীর সহজলভ্য হওয়ায় মৃৎশিল্প অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। একদিকে দামে সাশ্রয়ী ও টেকসই হওয়ায় এবং প্লাস্টিক সামগ্রী রিসাইক্লিং করার সুযোগ থাকার কারণে প্রস্তুতকারকরা ক্রেতাদের বাড়তি সুবিধা প্রদানের জন্য ক্রেতারা প্লাস্টিক সামগ্রী কেনার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এসবের পরও বাংলাদেশে এই শিল্পটির কদর কম নয়। এখনো এমন কোনো বাড়ি বা ঘর পাওয়া যাবে না, যেখানে মৃৎপণ্য নেই। ঘর-গেরস্থালি থেকে শুরু করে নান্দনিক শিল্পকর্ম হিসেবে এই পণ্যগুলো এখন নি¤œবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের রান্নাঘর ছাড়াও ড্রইংরুমে শোভা পাচ্ছে। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই বংশপরম্পরায় মৃৎশিল্পীদের তৈরি এসব পণ্য দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে চাহিদা রয়েছে। মৃৎশিল্পের প্রধান উপকরণ মাটি নদীমাতৃক বাংলাদেশে সহজলভ্য। এ কারণে এই শিল্পটির সম্ভাবনা বাংলাদেশে উজ্জ্বল। সরকারি, বেসরকারি সহায়তায় এই শিল্পটির প্রসার একদিকে যেমন কুমার সম্প্রদায়কে তাদের বাপ-দাদার পুরনো ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখে স্বাবলম্বী করতে পারবে। তাছাড়া প্লাস্টিক শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মৃৎশিল্পীরাও মাটি দিয়ে এন্টিকস তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। এদের মধ্যে শিক্ষা চেতনা ঢুকেছে। ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেকেই এ পেশায় আসছে। তাতে পেশাও গতিশীল হচ্ছে। এগুলো বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন আমাদের অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করতে পারে। সেই সঙ্গে নারীর অংশগ্রহণ, তার সম্মান ও মজুরির সঙ্গে তার অধিকার নিশ্চিত হবে এমন প্রত্যাশা আমাদের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.