কল্পনার এক বিচিত্র জগৎ সৃষ্টি করেছেন জে কে রাওলিং

0
68

নিশ্চিত সাফল্য লাভের মতো ১০ সূত্র আমি আসলে পাইনি। কথা দিলাম, তেমন সূত্র পেলে আপনাদের জানাব। সত্যি কথা হলো, বেশির ভাগ মানুষ যেটিকে কানাগলি ভেবেছিল, আমি ঠিক সেদিক পানেই একলা ছুটেছি। ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেতে খেতে পেয়েছি সাফল্যের দেখা। নব্বইয়ের দশকে মানুষের মনে কিছু ধারণা পোক্ত হয়েছিল—‘(গল্পের) ছেলে চরিত্রগুলো ভীষণ সেকেলে’, ‘বোর্ডিং স্কুলগুলো একেকটি অভিশাপ’, ‘শিশুদের বই ৪৫ হাজার শব্দের বেশি হওয়া উচিত নয়’। একলা ছুটতে গিয়ে আমি সেই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দিয়েছি।

তাই কী ‘অবশ্যই করতে হবে’ ভুলে যান, মনোযোগ দিন সেসব বিষয়েই, যেগুলো ছাড়া সম্ভবত বেশি দূর যেতে পারবেন না:
পাঠাভ্যাস

নবীন লেখকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের পোকা না হলে ভালো লেখক হতে পারবেন না। কী করলে একটি ভালো বই হয়, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ আপনি করতে পারবেন অনেক পড়লে। লেখালেখিতে কোন বিষয়টি কাজে আসে, কোনটি আসে না, তা-ও আপনি ধরতে পারবেন। উপলব্ধি করতে পারবেন, বইয়ের কোন বিষয়টি ভালো লাগল এবং কেন লাগল। লেখালেখির শুরুতে আপনি হয়তো আপনার প্রিয় লেখককে অনুকরণ করবেন, যা হাত মকশো করার বেশ ভালো উপায়ও বটে। কদিন পরই অবশ্য আপনি খুঁজে পাবেন আপন কণ্ঠস্বর।

নিয়মানুবর্তিতা

নির্ভেজাল অনুপ্রেরণার মুহূর্তগুলো ঐশ্বর্যমণ্ডিত। তবে অনুপ্রেরণা নয়, লেখকজীবনের বড় অংশই হলো পরিশ্রম। ভেতর থেকে না এলেও অনেক সময় আপনাকে লিখে যেতে হবে।

দৃঢ়তা এবং বিনয়

প্রত্যাখ্যান এবং সমালোচনা একজন লেখকের জীবনের অংশ। তথ্যবহুল প্রতিক্রিয়া খুব কাজে আসে এবং অপরিহার্যও বটে। শ্রেষ্ঠ লেখকদের অনেকেই একাধিকবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। নিজের লেখা পাঠকের পাতে তুলে দেওয়ার পর আপনি যদি উতরে যান এবং আরও সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন, তাহলে এর চেয়ে দারুণ কিছু আর হয় না। সবচেয়ে কঠোর সমালোচক আসলে বাস করে আপনার নিজের মস্তিষ্কে। ইদানীং আমি ওই সমালোচককে ঠান্ডা করতে বিস্কুট খেতে দিই। হাতে বিস্কুট ধরিয়ে দিয়ে বিরতিতে পাঠাই। শুরুর দিকে অবশ্য সপ্তাহখানেকের বিরতিতেও পাঠাতাম। আমার মস্তিষ্কের ওই সমালোচক লেখাটিকে যতক্ষণ না সুদৃষ্টিতে দেখত, ততক্ষণ বিরতি পর্ব অব্যাহত থাকত। এর ফলে ফিলোসফারস স্টোনের (হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম কিস্তি) ভাবনা মাথায় আসা থেকে বই আকারে প্রকাশের মধ্যে কেটে গিয়েছিল সাত–সাতটি বছর। আমি তো ভাবনাটিকে ছাইপাঁশ হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। এ কারণে মাসের পর মাস পাণ্ডুলিপিটি দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম।

সাহস

আপনি যা করতে চান, তা না করতে পারার সবচেয়ে দুঃখজনক কারণ হলো ব্যর্থ হওয়ার ভয়। আমার প্রথম বইটি এজেন্ট এবং প্রকাশকদের কাছে দাখিল করার সাহস তখনই খুঁজে পাই, যখন উপলব্ধি করতে শুরু করি যে সামনে ব্যর্থতা সুস্পষ্ট। তখনই স্থির করি ফেলি, যে কাজটি আজীবন করতে চেয়েছি, ঠিক সেটিই আমি করতে যাচ্ছি এবং এটাও মেনে নিই, সফল না হলে আরও বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তবু জীবন থেমে থাকবে না।

কেউ কেউ সব সময় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তর করতে চায়, কিন্তু পেরে ওঠে না। আপনি কি চান না এমন একজন হতে, যে স্বপ্ন সত্যি করতে সমর্থ?

স্বাধীনতা

এই লেখার মাধ্যমে আমি আপনাকে অন্ধের মতো ‘সেরা ১০ পরামর্শ’ অনুকরণ করতে নিরস্ত করছি। আজকাল যা কেবল অনলাইনেই নয়, আস্ত বইয়ের বিষয় হয়ে উঠেছে। ‘কী করে বেস্ট সেলার বই লিখবেন’/ ‘বই প্রকাশ করতে হলে যা করতেই হবে’/ ‘লিখে লাখপতি হওয়ার উপায়’—এই বইগুলো সফল বানিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে রীতিমতো অঙ্গীকার করে বসে।

আমি তো প্রায়ই নবীন প্রতিশ্রুতিশীল লেখকদের ‘রাইটার বিঅয়্যার’ (accrispin.blogspot.com) ওয়েবসাইটটিতে ঢুঁ মারতে বলি। কী করলে কী হবে, কী করলে ভালো বা কোনটি করা উচিত নয়—লেখালেখির বেলায় এসব নিয়ে যাঁরা ভাবেন, তাঁদের জন্য দুর্দান্ত এক ওয়েবসাইট এটি। আমার মন্দ কপাল, যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন এসবের কিছুই ছিল না, বিশেষ করে অনলাইনে।

জীবনের মতো লেখার ক্ষেত্রেও নিজেকে উজাড় করে দিন। যেখানে সম্ভব সেখানে নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করুন। যতটা পারা যায় শিখুন। এটা মানতে হবে যে একেবারে নিখুঁত মানুষ বিরল। সে তুলনায় নিখুঁত শিল্পকর্ম খানিকটা কম বিরল। আমি প্রায়ই রবার্ট বেঞ্চলির এই কথা থেকে সান্ত্বনা খুঁজে নিয়েছি, ‘লেখালেখির প্রতিভা যে আমার ছিল না, তা আবিষ্কার করতে পনেরোটা বছর লেগেছিল, কিন্তু তারপরও লেখালেখি আমি ছেড়ে দিতে পারিনি। কারণ, তত দিনে আমি বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলাম।’

কথাটি বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতেই বলছি। আসলে ‘জীবন’ আর ‘লেখকজীবন’ আমি আলাদা করতে পারি না। লেখালেখি ভালোবাসার চেয়েও বেশি কিছু, এটি আবশ্যকতা। আমি তো মনে করি, আমার এই সচেতন জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটাতে হবে কাল্পনিক জগৎগুলোতেই। এর ফলে আমার বাহ্যিক জীবনে কিছু বিষয়ের ঘাটতি তো হবেই। কেউ কেউ হয়তো এতে দুঃখ-কষ্ট খুঁজে পাবেন। কিন্তু ব্যাপার আসলে তেমনটা নয়। ভালোবাসায় ঘেরা একটি পরিবার এবং প্রিয় কিছু কাজকর্ম নিয়ে মোটের ওপর আমি সুখী মানুষ। এটা ঠিক যে আমার মাথায় অন্য অনেক জগতের কারবার চলে। যে জগৎগুলোর ভেতরে আমি প্রায়ই পা হড়কে ঢুকে পড়ি এবং বেরিয়েও আসি। আমি জানি না এর বাইরে অন্য কোনোভাবে বেঁচে থাকতে কেমন লাগে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.